নিষিদ্ধ গদ্য…

foring974 গল্প

 

 

 

 

 

 

 

 

মিতুল অনেকক্ষণ ধরে মেঘদেখছে । এই অনেকক্ষণটা কতক্ষণ সেটা জানার তাড়া নেই ওর। অন্য সময় তাড়া থাকে।ঘরে ফেরার তাড়া, স্কুলের তাড়া, কোচিং এর তাড়া, ক্রিকেটের তাড়া, ধলা মন্টু কে মাইর দেবার তাড়া,  আরও কত কি। হিসেব অনুযায়ী আজও ওর তাড়া থাকার কথা। আগামীকাল সম্ভবত কোন একটা টেস্ট আছে।কি টেস্ট ঠিক এই মুহূর্তে ও মনে করতে পারছে না । তাতে অবশ্য কোন ক্ষতি নেই। পৃথিবীর কাছে আজকের দিনটা খুব সাধারণ দিন কিন্তু মিতুলের কাছে হঠাৎ করেই দিনটা পালটে গেছে। খুব কান্না পাচ্ছে ওর। কেন পাচ্ছে সেটাও ও জানে না। শুধু জানে কি যেন চাই ওর। খুব খুব চাই কিন্তু কি চাই , কেন চাই ও জানে না।

ছেলে মানুষের কাঁদতে নেই। বন্ধুরা যদি জানে মিতুল কেঁদেছে , তাহলে মিতুলের প্রেস্টিজ এর বারটা বেজে যাবে। আদিব জানলে তো কথাই নাই। পুরা স্কুলে ছড়িয়ে দেবে। মিতুল এসব ভাবতে ভাবতেই দুবার ডান হাতের উল্টো পীঠ দিয়ে চোখ মুছে ফেলল। মৃদু স্বরে কথা বলে বুঝে নিল ওর গলা কাঁপছে কিনা।

এই রিক্সা, মামা যাবা ?

মামার ভাব ভাল না। চোখের উপরে গামছার ফাঁকা দিয়ে  মিতুল এর দিকে তাকিয়েও তাকাল না।

–     মামা রিক্সা জমা দেওনের টাইম হইছে। কই যাইবেন ?

মিতুল এই ভাষার সাথে ভাল করেই পরিচিত। এদিক ওদিকে তাকিয়ে আর একটা রিক্সা খুঁজল । মামার কথাই ঠিক , আজ ঠাডা ভাঙা রোদ । খালি রিক্সা তো দুরের কথা ভরা রিক্সাও  কম।

এবার ওর গলার স্বরে অনুনয় চলে এল।

মামা চল। ভাড়া বেশি দিবনে। এবার মামার সম্ভবত  দয়া হল । মুখ থেকে গামছা সরিয়ে খানিকটা নড়ে চড়ে বসল। মনে মনে নিশ্চই হিসাবটাও কষে ফেলল।

–       ঠিক আছে চলেন নিয়া যাই। পোসাইয়া দিয়েন।

আজকাল রিক্সার সিটগুলা কেমন উঁচু উঁচু। বসে আরাম পাওয়া যায় না। তার উপরে এই রিক্সার সিটটা বেশ শক্ত। মিতুলের বসতে কষ্ট হচ্ছে। কিন্তু ও সে সব ভাবছে না, ও শুধু ভাবছে গত তিন মাসে ওর মধ্যে এই পরিবর্তন কেন এল। কেন ও আজকাল নিজেকে ভয় পায় , কেন মনে হয় নিশ্চই কোথাও কোন ভুল হচ্ছে।

ক্লাসের শেষ সারির প্রথম ডেস্কটা  মাস তিনেক আগেও ওর কাছে কোন ব্যাপার ছিল না। কিন্তু আগস্ট এর নয় তারিখ থেকে ও প্রথম অনুভব করতে শুরু করে ঐ সিট ওর কাছে কিছু একটা। সারা ক্লাস ও তাকিয়ে ছিল ঐ সিটে বসা মানুষটার দিকে। কি প্রচণ্ড মায়া , কি প্রচণ্ড টান সে কেবল মিতুলই টের পেয়েছে।

সেই থেকে শুরু। রোজ দেখা, বিছানায় শুয়ে ভাবতে ভাবতে ঘুমিয়ে যাওয়া আবার ঘুম ভেঙে সেই একই মুখ । রোজ কথা বলতে চাওয়ার আকুতি অথচ এই তিন মাসে খুব দরকারি কোন কথা ছাড়া ওদের মধ্যে কথা হয়নি। গত মাসে ডিবেট প্রতিযোগিতা হল। ফাইনালে উঠে মিতুলের টিম হারল। এত তুখোড় বক্তা মিতুল অথচ সেদিন এতগুলা পয়েন্ট ভুল করল! ওর দলের সবাই কোন ভাবেই মেলাতে পারল না , হঠাৎ করে মিতুলের সেদিন কি হয়েছিল, হেরে গিয়েও ওর মধ্যে কোন আক্ষেপ ছিল না কেন ! বরং আদিব তো বলেই ফেলেছিল , তুই দেখি হাইরা গিয়া মহা পাটে আছিস !কাহিনী কি ?

মিতুল কিছু বলেনি । শুধু ও-ই জানে প্রতিপক্ষ টিমে সে ছিল। জিতে গিয়ে খুব হেসেছিল সে । ঐ হাসির জন্য মিতুল একবার না শতবার হারতে রাজি।

এই অনুভূতির কোন নাম আজও দিতে পারেনি ও। ওর বার বার মনে হয়েছে নিশ্চই এসব ওর মনের ভুল। নইলে কিভাবে সম্ভব !

রোজ রোজ পুরো টিফিনের সময়টা মিতুলের কেটে যেত আড় চোখে তাকিয়ে তাকিয়ে। ক্রিকেট ওর খুব প্রিয় কিন্তু এর থেকেও ওর প্রিয় ছিল কার দিকে তাকিয়ে থাকা। ওর অংক খাতায় কাটাকুটি খেলা হয় নি বহুদিন , পাতাগুলো নীরবে হাহাকার করে , ওরা যে মিতুলের এই আচরণে মোটেও অভ্যস্ত নয়, মিতুল সেটা ভাল করেই জানে , কিন্তু…।

–    মামা ডাইনে না বাঁয়ে ?

রিক্সা ওয়ালা মামার কণ্ঠে মিতুল এর ঘোর কাটল । ওর মনে হল রাস্তার প্রতিটি চোখ যেন ওর ভাবনাগুলো পড়ে ফেলছে। আয়না নেই সাথে , তবুও ও টের পেল ওর কানের লতির উষ্ণতা । মিতুল নিজেকে সামলে নিয়ে বলল ,

ডানে যাও মামা। মহিলা কলেজ এর ছোট গেটের উল্টা দিকের বাড়িটা।

মিতুলের আবারও কান্না পাচ্ছে। বার বার মনে পড়ছে আজ সকালের কথা। এমনিতেই আজ ঘুম ভেঙেছে দেরিতে। দাঁতটা কোন মতে ব্রাশ করে , ব্যাগ গুছিয়ে রীতিমত দৌড়ে বড় রাস্তায় গেছে রিক্সা খুঁজতে।আজ ওর ভাগ্যটা ভাল , আলম মামা যাচ্ছিল ওই পথে । সে তার বাইকে ওকে স্কুলে নামীয়ে দিয়েছে, নইলে সুনীল স্যার এর ক্লাস নির্ঘাত মিস যেত। আজ সকালের তাড়াহুড়োয় মিতুল খেয়াল করেনি শেষ সারির প্রথম ডেস্কটা ফাঁকা। আজ ওখানে কেউ বসেনি । সেকেন্ড পিরিয়ড এ মিতুল যখন প্রথম খেয়াল করল তখনও খুব বেশি ভাবেনি ও ।

কিন্তু টিফিনের ঘণ্টা পড়ার সাথে সাথে মিতুলের চারপাশ কেমন ফাঁকা হয়ে গেল। ওর পরিচিত সব কিছু ওর অসহ্য মনে হতে লাগল । কেউ যেন হঠাৎ ওর সব কিছু কেড়ে নিয়েছে। মিতুল কাউকে কিছু বলতে পারেনি। নীল কলমটা শক্ত করে চেপে বসেছিল ক্যান্টিনের কর্নারে। কার সাথে কোন কথা বলেনি । শুধু সাকিব যখন বলল , কিরে সকালে কই ছিলি ? তন্ময় এর ফেয়ারওয়েলে তুই এলি না যে ? ও তোকে খুব খুঁজছিল, বলছিল ক্লাসের সবার সাথে ওর বন্ধুত্ব হয়েছে শুধু তুই ওর সাথে কখনো কথা বলিস নি। কেন বলিস নি ? কি কারণে ওরে তুই এত অপছন্দ করতি দোস্ত ? তন্ময় এর আব্বু ঢাকায় বদলি হয়ে গেছে। তন্ময় এর নতুন স্কুল নাকি কাম্বাইন্ড। শালার আমাগো কপাল খারাপ। স্কুলে কোন মাইয়া নাই………।

এরপরের কথাগুলো মিতুল কিছুই শোনেনি। সাকিব চলে যাবার সময় ওকে একটা ধাক্কা দিয়ে গেছে , এটাই শুধু ওর মনে আছে।

মিতুলের রিক্সা থেমেছে , ও ওর মানিব্যাগ থেকে বিশ টাকার নোটটা ছুড়ে দিয়ে সোজা বাসার দিকে দৌড়ে চলল। ওর রুমের দরজাটা আজকে ওর অনেক দূরে মনে হচ্ছে। মিতুল ছুটছে , পাগলের মত ছুটছে। যে কোন মূল্যে দরজাটা ওকে ধরতেই হবে ।আজ থেকে ও ওর সমস্ত অনুভূতি লুকিয়ে ফেলবে ঐ দরজার পেছনে। এই জগত , এই সমাজের কাছে মিতুলের এই অনুভূতি অন্যায় , পাপ , নোংরা । তাই আজ থেকে ওর এই একান্ত অনুভূতি দরজার পেছনে আড়াল হয়ে যাবে চিরদিনের মত।

কেউ জেনে যাবার আগেই মিতুল কে পৌঁছুতে হবে দরজার পেছনে । মিতুল ছুটছে , ছুটছে আর ছুটছে …।

 

You May Also Like..

চিঠি ও আমাদের গল্পটা ……

যে নামে তোমাকে অনুভব করি তার কোন একক শব্দ খুঁজে পেলাম না , তাই বাধ্য হয়েই সম্বোধন এর যায়গাটা খালি […]

অরণীর অবেলা….

অরণীর আজ অনেক কাজ। একটা একটা করে লিস্ট করেছে গত দুমাস ধরে।অবশেষে আজ এল সেই দিনটা । স্বভাবতই ওর উচ্ছ্বাসিত […]

হ্যালো ?

হ্যালো ? শুনতে পাচ্ছ ? – হুম পাচ্ছি । সিগারেট টানছ ? – হ্যাঁ । তুমি টের পেলে কি করে […]

1 Comment

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *