ডানা ভাঙা বিড়াল

foring974 গল্প

স্লো-মোশন সময় ভারী অদ্ভুত। একটা দিন মানে ২৪ ঘণ্টা, ছিয়াশি হাজার চারশো সেকেন্ড কে এতটা দীর্ঘ মনে হয়নি কখনো। রাত দিনের পার্থক্য আজকাল টের পাই না। হঠাৎ তাকিয়ে দেখি রাত হয়ে গেছে, আবার হঠাৎ দিনের আলো দেখে মনে হয় সমস্ত সময়টাই বুঝি দিন। এই তো সেদিন ক্লাসে যাবার তাড়া ছিল। দীর্ঘ জ্যামের বিরক্তি কাটিয়ে ছুটে যাওয়ার তাড়া ছিল। এক কাপ চায়ের তাড়া ছিল। খুব কাছ থেকে দেখা জীবনের রঙ রূপগুলো হঠাৎ ফ্যাকাসে হয়ে যাবার দুঃস্বপ্নটা বাস্তব হয়ে গেছে, অথচ সেই আমি আজও একই আছি।

ধুর কি সব ভাবছি , অহেতুক জঞ্জাল সব। ডাক্তার বলেছে এসব না ভাবতে। এসব ভাবলেই আমাকে ইনজেকশন দিয়ে ঘুম পারিয়ে দেয় নার্স। তাই একদম ভাবব না এসব।

ও হ্যাঁ , আমাকে পরিচয় করিয়ে দেই । আমি নিশাত। কোন এক নিশিতের ভালবাসার ফল হয়ে মায়ের জঠরে আশ্রয় পেয়েছিলাম বলে, হয়ত মা শখ করে নাম রেখেছে নিশাত । আমার মা ভাল গান গাইত এক সময় । তখন তার  দুরন্ত যৌবন ছিল , মেঘের রঙ দেখে আপ্লুত হবার আবেগ ছিল।সে সব অবশ্য অতীত। আব্বা যখন কোন এক তরুণীর হাত ধরে আম্মা কে ছেড়ে গেল তখনো তার যৌবন ছিল। কিন্তু সে সব সে ভাবেনি। ভেবেছে আমার কথা আমার ছোট বোনটার কথা। এখন বার্ধক্য এসেছে।  আজকাল সে অপেক্ষা করে সময় ফুরবার। অপেক্ষা করে পুড়নো স্মৃতি থেকে কোন বন্ধুর হ্যালো শোনার।  ভেতরের সেই টগবগে তরুণী তার তারুণ্য নিঙরে সন্তান লালন পালন করেছে। আর দশটা বাঙালী নারীর মত সংসার নামক তেজী ঘোরাটাকে বসে আনতে আনতে পাকিয়েছে কালো চুলের খোঁপা। আজ তার চোখে শুধুই ক্লান্তি।

আর আমি ? হ্যাঁ আমি , বলার মত অসংখ্য কথা জমে আছে কিন্তু বলবটা কাকে ?এখান থেকে বেড় হতে দেয় না ওরা আমাকে। সকালে নিয়ম করে হাটতে দেয় কিন্তু পাশের নার্স মহিলাটা ভারী বেরসিক। কিছু বলতে চাইলেই বকাবকি করে। আমাকে মেরেছে দুবার। ওকে ভয় পাই আমি। ফয়সাল কে বলা যায়। কিন্তু ও এখন কম আসে। আগে অবশ্য সপ্তাহে একবার আসত কিন্তু এখন মাসে একবার আসে। ও অনেক ব্যস্ত।

ফয়সাল কে যেদিন বলেছিলাম ভালবাসি সে দিন ওর ঠোটে চুমু খেয়েছিলাম। ওর অনভ্যস্ত চুমুতে আগুন ছিল। ঝলসে গিয়েছিল আমার সমস্ত হৃদয়। কাটা ঠোট ঢাকতে দুদিন বেড় হইনি ঘর থেকে। আম্মা কেমন সন্দেহের দৃষ্টিতে তাকাত। কিন্তু আমি তাকে মোটেও বুঝতে দেয়নি। আজ ফয়সাল আছে , শুধু হারিয়ে গেছে সেই উত্তাপ। সেখানে ভর করেছে অভ্যস্ততা, অনীহা।  গত মাসে দেখেছিলাম ওর সীঁথির চুলে সাদাটে রঙ লেগেছে। সেটা নিয়ে কোন আক্ষেপ নেই ওর । সময় নাকি অনেক  বয়ে গেছে , তাই বার্ধক্য কে ওর স্বাভাবিক মনে হয়। অথচ এমন তো হবার কথা ছিল না। হাতে হাত , কপালে ঠোট ছুঁইয়ে প্রতিজ্ঞা করেছিল,

বৃদ্ধ হব না বালিকা // আজীবন তোর বালক হয়ে রইব।

অথচ …।

ব্যাংকের চাকরী ওর । মান্থ ক্লোজিং ডে তে  অনেক রাত করে  ফিরত। অবশ্য নটার আগে ওর ফেরা হয়নি কখনো। ডালে লবণ কম হলেও সেটা খেয়াল করার শক্তিটুকু ও ফেলে আসত  অফিসের কোন পেপার বাস্কেটে। প্রথম প্রথম  রাগ করতাম। গাল ফুলিয়ে বসে থাকতাম। বছর তিনেক আগেও এতে খানিকটা কাজ হত,  এর পর আমার রাগ ওর কাছে শুধুই সাংসারিক জটিলতা হয়ে উঠেছিল। সেই চিরাচরিত নিয়ম মেনে আমিও মানিয়ে নিয়েছিলাম। রাগ অভিমানের চ্যাপ্টার বন্ধ করে সু-গৃহিণী হবার চেষ্টা করেছিলাম ।

কিন্তু …।

গত ২৪ মাসে এই কিন্তু… টাই আমাকে বিহ্বল করেছে বারবার। যে  পাখি আকাশে উড়ত তাকে খাঁচায় পুড়ে আদুরে বেড়াল বানাতে চেয়েছিল ফয়সাল। বেড়াল হলাম  কিন্তু ডানা দুটো রয়ে গেছে। ওরা উড়তে চাইত। বারান্দায় গেলেই মনে হত গ্রিল ভেঙে উড়ে যাই। একবার তো গ্রিলে হাত কেটে রক্তারক্তি অবস্থা হল। ডান হাতে চরাটা স্টিচ লেগেছিল। সেই প্রথম ফয়সালের চোখে আতঙ্ক দেখেছিলাম। ওর বেড়ালের পাখি হবার শখ দেখে ও ভয় পেয়েছিল। বহুদিন পরে সে দিন আমি হেসেছিলাম। তৃপ্তির হাঁসি।

ফয়সাল কে বলেছিলাম আমাকে একটা বাচ্চা দাও। ও রাজিও হয়েছিল , পরে ভেবেছি ভালোবাসাহীন সম্পর্কে আর একটা প্রাণ আনব কেন ? আমি তো জানি ফয়সাল আমাকে ভালবাসে না। ওর শার্টে যে নতুন পারফিউমের গন্ধটা প্রায়ই  পেতাম, সেটা তো আমার কিনে দেয়া না। একবার ভেবেছিলাম জিগ্যেস করব , খানিক পরেই মনে হল কি লাভ। যে শঙ্কা ভুল হবে ভেবে খানিকটা আশার প্রদীপ জ্বালিয়ে রেখেছি সেটা যদি নিভে যায় তবে আমার কি হবে। খুব স্বার্থপরের মত নিজের কথাই শুধু ভেবেছি । কে চায় সব হারিয়ে নিঃস্ব হতে । আলো ভেবে আলেয়ায় না হয় বেঁচে থাকি আরও কিছু দিন।

ওর শার্টগুলো তাই ডলে ডলে ধুতাম। তবুও গন্ধটা যেত না। দুটো শার্ট পুড়িয়ে দিয়েছিলাম তাতেও গন্ধটা গেল না। সেবার ফয়সালা খুব রাগ করেছিল। আমাকে পাগল, উন্মাদ বলে খুব গালাগাল করেছিল। রাগ করে ভাত খায়নি। কিন্তু ও কেন বুঝল না ,  আমি তো এমনি এমনি এসব করিনি । ঐ গন্ধটা আমাকে কষ্ট দিচ্ছিল। আমি আর পারছিলাম না তাই শর্ট পুড়িয়ে দিয়েছিলাম। ওকে বোঝাতে চেয়েছি বারবার , ও বুঝলো না ।

আম্মা কে ডেকে কি সব বলল। আমার বোকা আম্মাটা আমাকে জরিয়ে ধরে শুধু কাঁদছিল। কতবার জানতে চাইলাম কি হয়েছে , আম্মা কিছুই বলল না , শুধু আমার ব্যাগ গুছিয়ে আমাকে এখানে নিয়ে এলো। আমি মোটেও আসতে চাইনি। ফয়সালের পা জরিয়ে ধরেছিলাম। ওকে বারবার করে বললাম , আমাকে প্লিজ তোমার কাছ থেকে আলাদা কর না। তুমি জান , তোমার বুকের গন্ধ না নিলে আমি ঘুমাতে পারি না। আমি প্রমিস করেছিলাম,  এখন থেকে ওর শার্ট ধরব না । ও যা ইচ্ছে করুক আমি আর রাগ করব না। আমি আর পাখি হতে চাইব না , ওর বিড়ালই থাকব । কিন্তু ফয়সাল শুনল না। আমাকে টেনে হিঁচড়ে গাড়িতে তুলে দিল। নিজে পর্যন্ত এলো না।

এখানে প্রথম দিকে খুব ভয় পেতাম। রাতে বাতি নেভালে চিৎকার করতাম তখন নার্স এসে খুব গালাগাল করত, ওয়ার্ড বয় আমার হাত পা চেপে ধরার সময় সমস্ত শরীরে হাত বুলাতো। আমি কিছুই বলতে পারতাম না , ইনজেকশনের ঘোরে হারিয়ে যেতাম আর কুৎসিত মাকড়শার স্পর্শ তাড়ানোর স্বপ্ন দেখতাম। এখন অবশ্য ওয়ার্ড-বয়টা আমাকে আর ধরে না, ডাক্তার কে নালিশ করেছিলাম। ডাক্তার খুব করে শাসিয়ে দিয়েছে ওকে। ডাক্তারটা ভাল , আমার খুব যত্ন করে । ওকে কিছু বললেই বলে

// এসব আপনার মনের কল্পনা। আপনাকে সবাই ভালবাসে কিন্তু আপনি সেটা বোঝেন না। পজিটিভ ভাবুন দেখবেন আবার আপনার স্বাভাবিক জীবনে ফিরে গেছেন//

আমি ডাক্তারের সব কথা শুনি। ওর কথা শুনতে ভাল লাগে। ওকে দেখে আম্মার কথা মনে হয়। আম্মা এখানে আসে না। আম্মার নাকি আমাকে দেখলে কষ্ট হবে তাই ছোট বোন আসতে দেয় না। ফোনে কথা হয়েছে কয়েকবার। ডাক্তার ওর ফোন দিয়েছিল আমাকে। আমি আম্মার সাথে কথা বলেছি।আম্মাকে বলেছি এই ডাক্তার ভাল ডাক্তার। ওর নামও ফয়সাল। এই ফয়সাল ভাল। এই ফয়সাল আমাকে কষ্ট দেয় না। এই ফয়সাল আমাকে বলেছে আমি শীঘ্রই আমার ফয়সালের কাছে  ফিরতে পারব। আমার ফয়সাল কেও বলেছে আমি নাকি সুস্থ হয়ে যাচ্ছি। আমার আর উড়তে ইচ্ছে করবে না। আমার আর গ্রিল ভাঙতে ইচ্ছে করবে না। আমি পুরোপুরি বিড়াল হয়ে যাব। আদরে , তুলতুলে  বিড়াল।

আমিও অপেক্ষায় আছি , একটা বিড়াল হব , ডানা ভাঙা শান্ত বিড়াল।

You May Also Like..

চিঠি ও আমাদের গল্পটা ……

যে নামে তোমাকে অনুভব করি তার কোন একক শব্দ খুঁজে পেলাম না , তাই বাধ্য হয়েই সম্বোধন এর যায়গাটা খালি […]

অরণীর অবেলা….

অরণীর আজ অনেক কাজ। একটা একটা করে লিস্ট করেছে গত দুমাস ধরে।অবশেষে আজ এল সেই দিনটা । স্বভাবতই ওর উচ্ছ্বাসিত […]

নিষিদ্ধ গদ্য…

                মিতুল অনেকক্ষণ ধরে মেঘদেখছে । এই অনেকক্ষণটা কতক্ষণ সেটা জানার তাড়া নেই ওর। অন্য সময় তাড়া থাকে।ঘরে ফেরার তাড়া, স্কুলের তাড়া, কোচিং এর তাড়া, ক্রিকেটের তাড়া, ধলা মন্টু কে মাইর দেবার তাড়া,  আরও কত কি। হিসেব অনুযায়ী আজও ওর তাড়া থাকার কথা। আগামীকাল সম্ভবত কোন একটা টেস্ট আছে।কি টেস্ট ঠিক […]

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *