অরণীর অবেলা….

foring974 গল্প, প্রেম

অরণীর আজ অনেক কাজ। একটা একটা করে লিস্ট করেছে গত দুমাস ধরে।অবশেষে আজ এল সেই দিনটা । স্বভাবতই ওর উচ্ছ্বাসিত থাকার কথা । বুকের বা পাশে হালকা করে স্পর্শ করে দেখল বিটগুলো আছে না থেমে গেছে ।

ওর ঠোটের কোনে সেই ভুবন ভোলানো হাসিটা একটু একটু করে আলো ছড়াতে শুরু করল। হ্যাঁ , ও আনন্দিত। শুধু আনন্দিত বললে কম বলা হবে , ওর ছাব্বিশ বছরের জীবনে আজকের দিনটা একেবারেই আলাদা।

অবশেষে ও যাচ্ছে নোনা জলের দেশে। গত কাল-ই চাকরিতে রিজাইন দিয়েছে। ওর অফিসের কলিগরা প্রথমে ভেবেছে আরও ভাল কোণ জব পেয়ে অরণী চাকরি ছাড়ছে। কিন্তু অরণী যখন হাসতে হাসতে বলল , আর কত এবার ছুটি নিতে চাই , সবাই এত অবাক হয়েছে যে ওকে ঠিকমত বিদায় জানাবে সেই কার্টিসিটুকু দেখাতে ভুলে গেছে। ও যখন লিফট দিয়ে নামছিল তখন ফিরোজ ভাই দৌড়ে এসে ওর পথ আটকে বলেছিল ,

– অরণী আর একবার ভেবে দেখতে পারতে, আমি জানি তুমি যোগ্য মেয়ে । চাকরি তুমি আরও পাবে কিন্তু আমাদের নতুন প্রজেক্ট এর ম্যানেজার তোমাকে করা হয়েছে, তুমি জান । দুএকদিনের মধ্যেই কনফার্মেশন লেটার চলে আসবে। তখন বেতন নব্বই এর নিচে হবে না। এত ভাল সুযোগ সব সময় আসবে না। তাই আরও একটু ভাবো , দরকার হলে ছুটি নাও। তুমি …।

ফিরোজ ভাই এর মুখের কথা কেড়ে নিয়েই অরণী বলেছিল ,

– মধ্যবিত্ত জীবনের কাছে বহুকিছু বন্ধক দিয়ে তবেই মিলেছে এমন চাকরি। সেটা যখন ছাড়ছি তখন ভেবেই ছাড়ছি । অনেক দিন হল অলস দুপুর দেখিনি। মাঝ রাতে জ্যোৎস্নার রঙ ছুঁইনি। অনেক অনেক কিছু বাকি , আমাকে আর বাধা দিয়েন না ভাইয়া।

ফিরোজ ভাই এর অবাক চোখ ফাঁকি দিয়ে সেদিন অরণী দ্রুত বেরিয়ে এসেছিল। ওর এই নিছক পাগলামির কোন মানে হয় না , সবাই এসব-ই ভেবেছে । ভেবেছে, ভাবুক , তাতে অরণীর কি ! ও জানে, ও কি চায় , কেন চায় , কেন চাইতে হয়।

ভাবতে ভাবতে ব্যাগটা গুছিয়ে ফেলল। কি সুন্দর গোলাপী রঙের ব্যাগ ! গত বছর শোয়েব কিনে দিয়েছিল। তখন অবশ্য ও একবারের জন্যও ভাবেনি, শুধু ব্যাগটাই থেকে যাবে, মানুষটা হারিয়ে যাবে স্মৃতির কোন বদ্ধ ঘরে , যেখানে ও কখনোই যেতে চাইবে না।

ইশ ! অ্যাভোমিন নেয়া হয়নি। বাসে উঠলেই ওর নাড়িভুঁড়ি উল্টে বমি আসে। সেই ছোটবেলার বদ অভ্যাসটা এখনো ওর সঙ্গ ছাড়ল না। মনে করে একপাতা সিভিটও কিনতে হবে। সিভিট ওর খুব প্রিয়। এখনো হ্যান্ড ব্যাগ খুললে দুএকটা পাওয়া যাবে, শোয়েব এটা নিয়ে খুব ক্ষ্যাপাত ওকে। হাসতে হাসতে বলত , কদিন পরে বাচ্চার মা হবে, অথচ আমার এখনি মনে হয়, বাচ্চা পালছি !

শোয়েব এর হাসিটা বড্ড মিষ্টি ছিল। ও কি এখন এমন খলখলিয়ে হাসে?

উহ ! কি সব ভাবছে অরণী । নিজেকে কষে একটা ধমক দিল। কত কত কাজ বাকি আর ও কিনা অহেতুক সময় নষ্ট করছে। ডায়েরিটা খুলে ভাল করে চেক করে নিল। প্রথমে যাবে কক্সবাঁজার, সেখান থেকে সোজা সেন্টমারটিন। একমাস নয় দিনের প্ল্যান। একটা কটেজ ভাড়া নিয়েছে। অফ সিজন বলে ভাড়া বেশ কম। অবশ্য এই কৃতিত্ব ফিরোজ ভাই এর। ওনার এক আত্মীয়ের কটেজ। ফিরোজ ভাই অরণীকে খুব স্নেহ করে। শুধু কলিগ বলে অবশ্য এই আন্তরিকতা তৈরি হয়নি। শোয়েব এর কাজিন সে । এই অফিসে আসার পরে একদিন শোয়েব-ই পরিচয় করিয়ে দিয়েছিল। মানুষ বদলেছে কিন্তু সম্পর্কটা রয়েই গেছে।

সেন্টমারটিন থেকে ফিরে নেপাল যাবার প্রস্তুতি নিতে হবে । অবশ্য অতটা সময় ও পাবে কিনা এখনো নিশ্চিত না । তবুও প্ল্যান করতে দোষ কি, তাই আগে ভাগেই প্ল্যান করে রেখেছে। অনেক বড় একটা কাজ অবশ্য বাকি আছে। বাক্সটা গুছিয়ে রেখেছে। যাবার আগে কুরিয়ার করে দিতে হবে। প্রায় পনের কেজির মত ওজন। ছটা শাড়ি, দুটা ফ্রেম, বেশ কিছু বই, একগাদা চিঠি আর একটা নতুন ম্যাকবুক। শেষ বার যখন কথা হল তখন শোয়েব বলেছিল ওর ল্যাপটপটা ঠিকমত কাজ করছে না। এবার কিনলে ম্যাক-ই কিনবে। তাই অরণী ম্যাক কিনেছে। শাড়িগুলো ওর আম্মা , ভাবি আর ছোট বোনের জন্য। বই শোয়েব এর খুব পছন্দ আর ফ্রেমগুলোতে ওর তোলা কিছু ছবি। এগুলো দেবার মত ছেলে মানসী ও কখনই করত না কিন্তু সময় অনেক কিছু করিয়ে নেয়। ঋণ রাখতে নেই। সময়ের সুদ বাড়তে বাড়তে পাহাড় হয়ে ঘাড়ে চাপবে। সে ভার নেবার আগেই দায় মুক্ত হওয়া ভাল।

 

দরজায় কে যেন নক করছে। সম্ভবত বুয়া। এই সময় বুয়া ওর রুম মুছতে আসে।

-অরণী তুই কটায় বের হবি ?

বুয়া না,  আম্মা। হাতে একটা লাল পলিব্যাগ।

– কিরে ? তোর বাস কটায় ? এখনো ভেবে দেখ, আমি সাথে যাই । একা একা যাচ্ছিস,  আর তোর শরীরের যে অবস্থা,  তাতে একা যাওয়া ঠিক না । আমার কথা শোন। আম্মার গলা ধরে এল।

অরণী ভাল করেই জানে আম্মা একবার কান্না শুরু করলে তাকে থামানো যাবে না। শেষমেশ এত কাঠখড় পুড়িয়ে রাজি করানোটাই ভেস্তে যাবে।

– আম্মা শোন, আমি ঠিকঠাক মত-ই ফিরব। তোমাকে তো আগেই বলেছি তনিমা যাবে আমার সাথে। একা যাব কে বলল, আর ওখানে আমার জন্য গাড়ি থাকবে। কোন সমস্যাই হবে না।

আম্মা খুব একটা আশ্বস্ত হল বলে মনে হল না । কিন্তু কান্না থামাল। হাতের ব্যাগটা অরানীর দিকে বাড়িয়ে দিল ।

-নে , নারকেলের নাড়ু , পুলি পিঠা আর চালতার আঁচার। যা যা চেয়েছিলি সব আছে। এই অসময়ে চালতা পাওয়া কি মুখের কথা।

অরণী জানে, এবার এই চালতা কিভাবে পাওয়া গেল, আম্মা সেই গল্প শুরু করবে। কিন্তু ওর হাতে সময় নেই। আবার আম্মা কে থামিয়ে দিতেও ওর মন চাইছে না। অবশেষে সময় জিতে গেল,

-আম্মা তুমি আমার লক্ষ্মী আম্মা। গল্প এসে শুনব । হাতে মাত্র একঘণ্টা আছে । রেডি হই। তুমি রাতুল কে বল আমাকে একটা ট্যাক্সি ডেকে দিতে।

আম্মাকে বিদায় করে অরণী ধপ করে বিছানায় বসে পরল। ও আম্মাকে একগাদা মিথ্যে বলেছে। ব্যাগ গোছানোই আছে, ও যাচ্ছে একা , আর অফিসের গাড়ি আসার প্রশ্নই আসে না। মিথ্যে না বলে উপায় ছিল না। আম্মা জানে অরণীর মন ভাল না । শোয়েব যখন শেষ বার বাসায় এসেছিল তখনি আম্মা ওর কথা শুনেই বুঝেছে এটাই ওর শেষ বার এর মত আসা । মা -রা সম্ভবত সব কিছু বুঝে ফেলার কঠিন ক্ষমতা নিয়ে জন্মায়। তাই কোন এক অদ্ভুত কারনে শোয়েব এর বিষয়ে আর কোন প্রশ্ন করেনি। শুধু অরণীর হাত ধরে বলেছিল ,

-আমি জানি না তোদের মধ্যে কি হয়েছে , শুধু বলি যা গেছে ভুলে যা । কষ্ট পুষে রাখিস না।

অরণীয় ওর মা কে বলেনি । কেন শোয়েব হঠাৎ করে চার বছরের সম্পর্ক শেষ করে দিল। অবশ্য বলার মত অনেক বড় কোন  কারন আজও ও খুঁজে পায়নি। শুধু জানে,  চার মাস আগে শোয়েব ওকে জানাল,  সম্পর্কটা একঘেয়ে হয়ে গেছে। সম্পর্কের ম্যাজিকটা নাকি ফুরিয়ে গেছে। এই সম্পর্ক টেনে নেয়া মানে দুটা জীবন নষ্ট করা। অরণী শোয়েব কে কিছুই বলেনি। বলার মত অবশ্য ওর ভেতরে কোন  অনুভূতি অবশিষ্ট ছিল না।

এর এক মাস পরে ও জেনেছে শোয়েব এর নতুন বান্ধবী নাকি হাফ বাঙালী হাফ ইরানী। ওরা খুব শীঘ্রই বিয়ে করছে।

এরপরে অবশ্য আর কোন খোঁজ ও নেয়নি।

অরণী ঘড়ি দেখল। বিশ মিনিট আছে মাত্র। আয়নার নিজেকে দেখে নিল। নীল  টিপে ওকে বেশ লাগে। বহুদিন নীল টিপ পরেনি ও। আজ পরল। যত্ন করে চোখে কাজল দিল। হালকা লিপস্টিক দিল ।শাড়ির আঁচলে পিন লাগাল। চুল ছেড়ে সামান্য একটু গুঁজে দিল কানের পাশে। নিজেই নিজের কাঁধ চাপড়ে দিল । ফিসফিস করে বলল ,

-মন খারাপ ছুড়ে ফেল অরণী, আজ তোমার ডাঙা মেলার দিন। আজ তোমার উড়ে যাবার দিন। যে হৃদয় তুমি ফেলে রেখছ দারুণ অবহেলায়, সেখানে আজ আনন্দের বৃষ্টি নামছে। চল, তুমি আমি মিলে আজ থেকে হাসি কুরাই। আঙিনায় জমুক শুধুই আনন্দ।

অরণী উঠে দাঁড়াল । ওর গোলাপী ব্যাগটা শক্ত করে ধরে পা বাড়াল দরজায়। সেখানে কেউ অপেক্ষা করে আছে ।

 

 

 

 

You May Also Like..

চিঠি ও আমাদের গল্পটা ……

যে নামে তোমাকে অনুভব করি তার কোন একক শব্দ খুঁজে পেলাম না , তাই বাধ্য হয়েই সম্বোধন এর যায়গাটা খালি […]

নিষিদ্ধ গদ্য…

                মিতুল অনেকক্ষণ ধরে মেঘদেখছে । এই অনেকক্ষণটা কতক্ষণ সেটা জানার তাড়া নেই ওর। অন্য সময় তাড়া থাকে।ঘরে ফেরার তাড়া, স্কুলের তাড়া, কোচিং এর তাড়া, ক্রিকেটের তাড়া, ধলা মন্টু কে মাইর দেবার তাড়া,  আরও কত কি। হিসেব অনুযায়ী আজও ওর তাড়া থাকার কথা। আগামীকাল সম্ভবত কোন একটা টেস্ট আছে।কি টেস্ট ঠিক […]

হ্যালো ?

হ্যালো ? শুনতে পাচ্ছ ? – হুম পাচ্ছি । সিগারেট টানছ ? – হ্যাঁ । তুমি টের পেলে কি করে […]

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *